ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে করে তুলেছে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যময় ও গতিশীল। কিন্তু ইন্টারনেটের সবকিছুই কি আমাদের জন্য মঙ্গলজনক? সম্ভবত নয়। ইন্টারনেটের
খোলা জানালা দিয়ে অনেক ভালো জিনিসের সাথে সাথে চলে আসছে অনেক ক্ষতিকর জিনিসও। আমরা বলি ইন্টারনেট হলও এমন একটি প্লাটফর্ম যা পৃথিবীর সব মানুষকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে।
এখন সবাই সবার সাথে একই প্লাটফর্মে কথা বলতে পারছে, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারছে। ইন্টারনেট দূর করে দিয়েছে ছেলে মেয়ের ভেদাভেদও। কিন্তু সত্যিই কি লিঙ্গ বৈষম্য দূর হয়েছে ??
অনেকে বলেন, ইন্টারনেট বা ডিজিটাল ডিভাইস গুলো হয়ে উঠেছে নারীর প্রতি অবমাননার এক নতুন হাতিয়ার। মোবাইল ক্যামেরায় তোলা কোন ব্যক্তিগত ছবি নিমিষেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে হাজারো মানুষের কাছ। যদিও আমাদের সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষগুলো আমাদের ঘিরে থাকা মমতাময়ী নারী মুখগুলো; কিন্তু কোন দু:ঘটনা ঘটলে কেন জানি আমরা তাদের দোষটাই খোজার চেষ্টা করি সবার আগে। যদিও সেখানে তাদের হয়তো কোন দোষই থাকে না। কোন বান্ধবীর সাথে মজার কোন ছবিই হয়ে যায় তার জন্য অনেক বড় কোন অপমানের কারণ। তাই মেয়েদের কে ডিজিটাল ডিভাইস বা ইন্টারনেট ব্যবহারে হতে হবে অনেক বেশি সাবধানী ও কৌশলী।
মোবাইলফোন
আমাদের দৈনন্দিন জীবন এখন মোবাইল ফোন ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। ইদানীং কালে একেকটি মোবাইল ফোন হয়ে উঠেছে একেকটি ছোট খাটো কম্পিউটার। সেখানে টেক্সট, ছবি, ভিডিও সহ সব ধরনের তথ্যই রাখা যায়। বিপত্তিটি বাধে তখন, যখন মোবাইল ফোনটি কোন খারাপ লোকের হাতে পরে। কোন মেয়ের মোবাইলে থাকতে পারে তার একান্ত ব্যক্তিগত কোন ছবি বা ভিডিও বা টেক্সট। এখন হারিয়ে যাওয়া মোবাইল থেকে তা নিমিষেই ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো ইন্টারনেটে। তাই মোবাইলে একান্ত ব্যক্তিগত কিছু না রাখাই ভালো। কারণ বলা যায় না কখন আপনার মোবাইলটি কোন আজে বাজে লোকের হাতে পড়ে।
এক ধরনের নিম্ন রুচির মানুষ আছে যারা মেয়েদের নম্বর পাবলিকলি ছড়িয়ে দেন। এতে করে ঐ মেয়েটির ব্যক্তিগত জীবন বাধাগ্রস্ত হয় । তাই কোন মেয়ের তার মোবাইল ফোন নম্বরটি যতদূর সম্ভব পাবলিকলি শেয়ার না করাই ভালো।
প্রেম ভালোবাসাতে সবচেয়ে বড় জায়গাটা বোধহয় বিশ্বাসের, আস্থার । কিন্তু আমরা নিকট অতীতে প্রেমের নামে অনেক মেয়েকেই প্রতারিত হতে দেখেছি। প্রেমিক, প্রেমিকার অনেক অন্তরঙ্গ মুহূর্ত মোবাইলের এমএমএসের মাধ্যমে পৌঁছে গেছে সবার হাতে হাতে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মেয়েটি হয়তো পরিস্থিতির শিকার কিন্তু পুরু সমাজের কাছে অপাংক্তেয় হয়ে যায় কিন্তু মেয়েটিই। তাই প্রেম ভালোবাসার মধ্যে মানবিক আর নৈতিকর প্রাধান্য দেয়াটাই সমিচিন আর থাকতে হবে ডিজিটাল ডিভাইস থেকে শত হাত দূরে। কারণ আজকে যাকে আপনি সবচেয়ে বিশ্বাস করছেন দেখা যাবে কাল সেই হচ্ছে আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু।
নতুন আরেক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, মোবাইল রিফিল করা নিয়ে। আপনার দেয়া নম্বরটি রিফিলের দোকান থেকে কিন্তু বিক্রি হয়ে যেতে পারে কোন বিকৃত রুচির মানুষের কাছে। অনেক রিফিলের দোকানদার টাকার বিনিময়ে মেয়েদের নম্বর বিক্রি করে দেয় এসব বিকৃত রুচির মানুষের কাছে। তাই পরিচিত দোকান থেকে রিফিল করাই ভালো বা কার্ডের মাধ্যমে রিফিল করা যেতে পারে।
রাতে বেলা বা অকারণে ফোন দেয়ার মতো নিম্ন রুচির মানুষও কিন্তু আমাদের সমাজে একবারে কম নয়। এক্ষেত্রে কল ব্লক অনেক সময় কার্যকরী ভূমিকা রাখে। তবে উত্যক্ত কারীর সংখ্যা যদি বেশি হয় তবে তা বড় রকমের অর্থ খরচ হয়। এক্ষেত্রে আমার বন্ধুরা একটা কাজ করে। আপনিও চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তাহলো উত্যক্ত কারীর ফোনটি রিসিভ করে কানের কাছ থেকে দূরে কোন জাগায় ফেলে রাখা। এভাবে বিনা কারণে মোবাইলের টাকা খরচ হলে উত্যক্ত কারী সাধারণত কিছুদিন পর ফোন করা বন্ধ করে দেন।
ইন্টারনেট
ইন্টারনেট হলও একটি পাবলিক প্লেস । তাই ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত তথ্য যত কম দেয়া যায় ততো ভালো। ইন্টারনেটে কখনোই ব্যক্তিগত ছবি, ঠিকানা বা ফোন নম্বর পাবলিকলি শেয়ার করা উচিৎ নয়।
ইন্টারনেটে প্রথমত আপনার ইমেইলটি যথেষ্ট মাত্রায় নিরাপদ রাখতে হবে। সমসাময়িক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়েরা তাদের পাসওয়ার্ড বেশির ভাগ সময় কারো না কারো সাথে শেয়ার করেন। মনে রাখতে হবে পাসওয়ার্ড কোন ভাবেই কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না তা সে যতই নিকটজন হোক না কেন।
কম্পিউটারে ভাইরাস বা স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটার থেকে অনেক ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়ে যেতে পারে। তাই কম্পিউটারকে সবসময় ভাইরাস মুক্ত রাখতে হবে। আপডেটেড অ্যান্টি ভাইরাস ব্যাবহার করতে হবে।
আমাদের তরুণদের অনলাইন কার্যক্রমের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে ফেসবুক । ফেসবুকের মাধ্যমে খুব সহজেই নতুন নতুন বন্ধু বানানো যায়। কিন্তু আমরা জানি না আসলে কার মনের মধ্যে কি আছে। তাই কাউকে বন্ধু বানানোর আগে ভালো মতো যাচাই করে নেয়া উচিৎ। আর কোন ইনফরমেশনই পাবলিক না করাই ভালো। ছবি বা কমেন্টগুলো অবশ্যই কেবল বন্ধুদের মধ্যে শেয়ার করা উচিত কোন ভাবেই পাবলিকলি না।
মনে রাখবেন যদি কোন ছবি বা ভিডিও একবার ইন্টারনেটে আপলোড হয়ে যায় তবে তা আর কোন ভাবেই পুরোপুরি মুছে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ কেউ না কেউ তা কপি করে নিজের কম্পিউটারে রেখে দিতে পারে এবং পরে আপলোড করতে পারে। তাই ইন্টারনেটে কোন তথ্য, ছবি, ভিডিও শেয়ার করার আগে ভালো মতো চিন্তা করে নিন।
আইনি ধারা ও আইনি সহায়তা
২০০৬ বাংলাদেশ সরকার সাইবার আইন প্রণয়ন করে । এটি সাধারণত ’The Information and Communication Technology Act 2006′ নামে পরিচিত ।
ধারা ৫৭ তে বলা আছে-
ইলেক্ট্রনিক কর্মে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও উহার দণ্ড:- (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্যকোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কোন প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনা কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতি ভ্রষ্ট বা অসৎ কাজে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন এর অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে বাধা প্রদান করা হয় তাহা হইলে তাহার এ কার্য হইবে একটি অপরাধ।
(২) কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে অনধিক দশ বছর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
পর্ণোগ্রাফি তৈরির অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে ‘পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ বিল-২০১২’ পাস হয়েছে সংসদে। এ আইনে পর্ণোগ্রাফির মাধ্যমে কারো মর্যাদাহানি বা কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা হলে, এমনকি এ জাতীয় কিছু সংরক্ষণ বা পরিবহন করা হলেও দুই থেকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং এক থেকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে।
বিলটি সম্পর্কে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে চলচ্চিত্র, স্যাটেলাইট, ওয়েবসাইট ও মোবাইলের মাধ্যমে পর্ণোগ্রাফি মারাত্মক ব্যাধির মতো দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। পর্ণোগ্রাফি যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর শিকার হয়ে অনেক নারী, পুরুষ ও শিশুকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও আইন না থাকায় অপরাধ রোধ ও অপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হচ্ছে না। বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।’
এ আইনে পর্ণোগ্রাফির মাধ্যমে কারো মর্যাদাহানি বা কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা হলে, এমনকি এ জাতীয় কিছু সংরক্ষণ বা পরিবহন করা হলেও দুই থেকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং এক থেকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে।
বিলটিতে আরও বলা হয়েছে,
“পর্ণোগ্রাফির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) বা তাঁর সমমর্যাদার কর্মকর্তাকে দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে আরও ১৫ দিন এবং আদালতের অনুমোদন পাওয়া গেলে আরও ৩০ দিন পর্যন্ত সময় নেওয়া যাবে। বিলের ৬ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, এ জাতীয় অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনও ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক ভাবে গ্রেপ্তার বা কোনও পর্ণোগ্রাফি সরঞ্জাম জব্দ করার জন্য তল্লাশি চালানো যাবে।”
শেষের কথা
যতদিন আমাদের সমাজ আরও বেশি সভ্য হয়ে না উঠছে । নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হচ্ছে ততদিন আমাদের নারী সমাজকে আরও অনেক বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে । আর যদি কোন দু:ঘটনা ঘটেই যায় তবে দ্রুত আইনি সহায়তা নিতে হবে ।
সর্বোপরি, আমাদেরকে লক্ষ রাখতে হবে আমাদের আদরের যে বোনটি, যার সম্মানের জন্য নিজের সবকিছু তুচ্ছ করতে পারি, সেই একই পরিমাণ আদর, ভালোবাসা আর সম্মান যেন অন্যের বোনটিকেও দিতে পারি । তবেই নির্মাণ হবে এক সুন্দর সমাজ । যে সমাজে মুক্ত আর স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে আমাদের সবার আদরের বোন । ধন্যবাদ সবাইকে ।
